নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের সংশয়

240


ভ্যাট ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর হতে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে এর প্রভাব অনিশ্চিত বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলছে, ভ্যাটে বহু স্তর এবং এই আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে ধসে যাচ্ছে। আর্থিক খাতে ঝুঁকি হ্রাসে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বলেছে আইএমএফ। ব্যাংকিং খাতে তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রণ জোরদারে একটি সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থার উন্নতি করতে একটি সময় বেঁধে দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সংস্থাটি এ অভিমত দিয়েছে।

আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল চলতি জুন মাসের ১৬ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন। ডাইসাকু কিহারার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিনিধি ছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফর শেষে এক বিবৃতিতে আইএমএফ প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সুপারিশও করেন।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে পাশ হওয়ার পর ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক) আইনটি আট বছর পর কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ ছাড়াও ১০ শতাংশ, সাড়ে ৭ ও ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হবে। এছাড়া ওষুধ ও কিছু স্পর্শকাতর পণ্যে দুই ও আড়াই শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় হবে। এর বাইরে কিছু পণ্যে ট্যারিফের আদলে ‘স্পেসিফিক ট্যাক্স’ হিসাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় হবে। পূর্ব থেকেই আইএমএফের পরামর্শ ছিল একক হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা। সেইসঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থাপনাকে অনলাইন ব্যবস্থায় নিয়ে আসা। কিন্তু এ জন্য এনবিআরের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে তাই রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে আইএমএফ।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছাড়াও মূল্যস্ফীতি তার লক্ষ্যের মধ্যেই থাকবে বলে আশা করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এবং প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ভাবে ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করে সংস্থাটি। ব্যাংকিং সেক্টরে ঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং কর রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। আইএমএফ মনে করে, অর্থনীতির বহুমাত্রিকতার জন্য ব্যবসায়ের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতির ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব।

আইএমএফ প্রতিনিধি ডাইসাকু কিহারা উল্লেখ করেন, নতুন অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো শক্তিশালী হবে। শক্তিশালী বেসরকারি ভোগ ব্যয়ের উপর ভর করে চলতি অর্থবছর (২০১৮-১৯) দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে। এবছর মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এমনটি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে তৈরি পোশাক শিল্পের উপর ভর করে রপ্তানি আয়ও বেড়েছে। রেমিট্যান্স প্রাবাহও বেড়েছে। ব্যাপক হারে আমদানি বাড়লেও এসব কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা সীমিত রয়েছে। আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশ হবার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাবার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিতে ভূমিকা থাকতে হবে।

বাজেটে সুদ পরিশোধের চাপ কমাতে জাতীয় সঞ্চয় পত্র বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুপারিশ করেছে আইএমএফ। বাংলাদেশে চলমান রোহিঙ্গা সংকটে সরকারের আর্থিক চাপ সীমিত থাকবে বলে মনে করছে আইএমএফ। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য বলেও উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশ উচ্চ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে চায়। এজন্য সংস্কারের কিছু অগ্রাধিকার সুপারিশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, ব্যাংকিং সেক্টরে ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হবে। সামাজিক চাহিদা, অবকাঠামোর বিনিয়োগ চাহিদা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে নিবিড়ভাবে তদারকি করতে হবে। ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ এবং খেলাপির মানদণ্ড পরিবর্তন করার বিষয়গুলো আরো সীমিত করতে হবে। কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ভূমিকা, সংকট মোকাবিলা এবং রেজুলেশন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে হবে। কর নীতি এমন হওয়া উচিত যাতে করের জাল বিস্তৃত হয়। সেইসাথে রাজস্ব আদায়ে কর পরিপালন হয়। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমে সমন্বয় ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে আধুনিকায়নের সুপারিশ করেছে আইএমএফ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here